আজ ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

সংগৃহীত ছবি

‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ অর্জিত হবে’


অনলাইন ডেস্কঃ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ‘মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভারসাম্যমূলক বাজেটের কারণে মুদ্রাস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে এনে আগামী অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৭৫ শতাংশের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি। শনিবার (৮ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতির মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে এ তথ্য জানান ওবায়দুল কাদের।

তার পাঠানো বিবৃতি হুবহু তুলে ধরা হলো-
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
‘গত ৬ জুন মহান জাতীয় সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী “টেকসই উন্নয়নের পরিক্রমায় স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা” শীর্ষক ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মানের অঙ্গীকার। এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংকট দূর এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে দেশের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে করোনা অতিমারি এবং বিশ্বে চলমান যুদ্ধ পূর্ববর্তী উচ্চ গতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে নেয়া। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সংকট কালে এ বাজেট বাস্তবসম্মত ও গণমুখী। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার “স্মার্ট বাংলাদেশ –
উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান” এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এ বাজেটকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে স্বাগত জানাচ্ছি। ভারসাম্যমূলক একটি বাজেট উপহার দেবার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকণ্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা এমপি এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপির প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ সংকটকালেও সফল রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত দেড় দশকে বাংলাদেশ একটি দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম বৃহৎ অর্থনীতি। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অগ্রগতির ফলে বাংলাদেশের জনসাধারণের জীবনমান দিন দিন উন্নততর হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন শুধু ডাল-ভাতে নয়, পুষ্টি উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ।

বাংলাদেশে এগিয়ে যাচ্ছে সব কয়টি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সূচকে। এ সময়ে মোট দেশজ উৎপাদন গড়ে ৬.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা সারা দুনিয়ায় উচ্চতম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্যতম করেছে। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আমাদের সরকার সবার মধ্যে পৌঁছে দিয়েছে যার ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দারিদ্র হ্রাস পেয়েছে। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে রেখে গিয়েছিল। জনগণের ধারাবাহিক সমর্থন নিয়ে আমাদের সরকার মাত্র ১৪ বছরের মধ্যে সে দারিদ্র্য ১৮.৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। অতি দারিদ্র এখন মাত্র ৫.৬ শতাংশ। প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার এ বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। বিগত বছরগুলোতে প্রতি বছরেই আমাদের বাজেটের আকার ১২/১৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাঘাত না ঘটিয়ে, কিছুটা কৃচ্ছ্রতাসাধন করে বিগত অর্থ বছরের তুলনায় এ বছরের বাজেট মাত্র ৪.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’

প্রিয় বন্ধুগণ,
আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, সুদের হার বৃদ্ধি, পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি এবং টাকার মান কমে যাওয়ার এ চতুর্মুখী চাপ আমাদের অর্থনীতিতে সৃষ্টি করে ডলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতি। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো মূল্যস্ফীতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলে ত্রুটি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া আমাদের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ। একই সময়ে দেশে গড় মজুরী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ শতাংশের বেশি হারে। মূল্যস্ফীতি এবং মজুরী বৃদ্ধির মধ্যে ২ শতাংশের একটা ফারাক রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক কম প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে। এতে আমদানি কমেছে বছরে ১৫ শতাংশের বেশি হারে যার ফলে সংকট কালেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৩ মাসের বেশি আমদানির জন্য ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। তা সত্ত্বেও টাকার মান ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে ২২ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে ফলে রিজার্ভ অনেক কমে গিয়েছে। দ্রব্যমূল্য ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। এবারের বাজেটেও তার পূর্ণ প্রতিফলন রয়েছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাহিদা কমিয়ে এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো যায়। এবারের বাজেট এই দুই পথের মিলন ঘটিয়েছে। দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কিছু দিন পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মূদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। যার মাধ্যমে সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে এবং নতুন পদ্ধতিতে পুনঃনির্ধারন করা হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার। এতে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে। নতুন করে ডলার সংকট হবার সম্ভাবনা আর দেখা যাচ্ছে না। রিজার্ভ এখন থেকে বাড়তে শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারের বাজেটে রাজস্বনীতি নির্ধারন করা হয়েছে যাতে কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচী চলমান রাখা হয়েছে, কর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমদানি বিকল্প উৎপাদন উৎসাহিত করা হয়েছে এবং কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রণোদনা ও ভর্তুকি চলমান রেখে তার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। বাজেটের এ সকল উদ্যোগ একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে অন্যদিকে রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ বাজেটের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী অর্থ বছরে মূল্যস্ফীতির গড় ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণ হবে বলে আশা করি।

প্রিয় বন্ধুগণ,
বাড়তি দ্রব্যমূল্যের অভিঘাত লাঘব করার জন্য নিম্ন আয়ের ৫০ লক্ষ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সমগ্র বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের প্রায় ১ কোটি পরিবারকে টিসিবির’র ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ লিটার সয়াবিন তেল, ২ কেজি মসুর ডাল, ১ কেজি চিনি এবং খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৩০ টাকা দরে ৫ কেজি চাল বিক্রি করা হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দেবার এ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে টিসিবি’র ফ্যামিলি কার্ডের পরিবর্তে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন বঙ্গবন্ধু চিরদিন অনুপ্রেরণার উৎস: ওবায়দুল কাদের

স্মার্ট সামাজিক সুরক্ষা দিতে ডিজিটাল ব্যবস্থায় ১ কোটি ১৫ লক্ষ ৩১ হাজার ৫৬৭ জনকে এ২চ পদ্ধতিতে ভাতা বিতরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ৯৩ শতাংশের অধিক ক্যাশভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর ভাতা এ২চ পদ্ধতিতে বিতরণ করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে তা শতভাগে উন্নীত হবে। দেশব্যাপী প্রতিবন্ধীতা শনাক্তকরণ জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। ৩৩.৩৪ লক্ষ প্রতিবন্ধীর তথ্য সম্বলিত নতুন সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। ভাতাপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা আগামী অর্থ বছরে ৩২ লক্ষ ৩৪ হাজারে উন্নীত করা হবে। নতুন বাজেটে তাদের ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ১,০৫০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ১ লক্ষ ৩০ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সহায়ক উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন ১ লক্ষ ৫০ হাজারের অধিক মা ও শিশু, ২ লক্ষ প্রবীণ, ২ লক্ষ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা, ৫ হাজার ৭৪৯ জন হিজড়াকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী অর্থ বছরে অনগ্রসর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর
৯০ হাজার ৮৩২ জনকে ভাতার আওতায় আনা হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে
বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার কোটি টাকা যা চলতি বছরের বাজেটের তুলনায় ২ হাজার
৪৭৩ কোটি টাকা বেশি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমাদের প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখা এবং তা সামনে এগিয়ে নিয়ে ২০৪১ সাল নাগাদ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য উন্নত মানের শিক্ষা ও গবেষণার বিকল্প নেই। শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে এবারের বাজেট গত বছরের চেয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যা সবগুলো খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। গবেষণার পূর্ববর্তী বরাদ্দগুলো বহাল রেখে স্বাস্থ্য ও জ্বালানী খাতে গবেষণার জন্য নতুন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত ৩৩ হাজার ২৮৫টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ১১ হাজার ৩০৭টি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৬৪ হাজার ৯২৫টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ১২ হাজার ল্যাব স্থাপন করা হবে। শিক্ষাকে সহজ লভ্য করার জন্য আমাদের সরকার বিগত ১৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি ও টিউশন ফি বাবদ ৯০০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে যার ৬০ শতাংশ উপকারভোগী নারী। কর্মোপযোগী শিক্ষা এবং যুবদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। ২০১০ সালে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ যা ২০২২ সালে ১৮.১৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বিষয়ক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল এণ্ড কলেজ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। অফলাইন এবং অনলাইনে মিশ্র পদ্ধতিতে কারিগরি শিক্ষা চালু করা হয়েছে। ২৪৯টি পেশার জন্য ৫১৩টি যোগ্যতা মানদণ্ড এবং ৬১৪টি যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ প্রণয়ন করা হয়েছে। সম্মানজনক বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে অধিকতর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি বিদেশি ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৩ লক্ষ ৭০ হাজার ৭০ জনকে দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৯ জন বিদেশ ফেরত কর্মীকে ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা বেশি।

প্রিয় বন্ধুগণ,
নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। ২০২৩ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ এর লক্ষ্যসমূহ অর্জনে এবং স্মার্ট স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণে আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল থেকে শুরু করে কমিউনিটি ক্লিনিক এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য কর্মীদের ইন্টারনেটে সংযোগসহ কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট দেয়া হয়েছে। সকল নাগরিককে একটি অভিন্ন হেলথ আইডি সম্বলিত হেলথ কার্ড সরবরাহের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক হেলথ ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ঔষধের ৯৮ শতাংশ এখন দেশে উৎপাদন হয়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ১৫০টির বেশি দেশে ঔষধ রফতানি হচ্ছে। চিকিৎসা গবেষণার ফলাফলের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত এবং সুসংগঠিত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে এ বাজেটে ১০০ কোটি টাকার নতুন গবেষণা তহবিল গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এ বছরের বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা যা গত বছরের তুলনায় ৩ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা বেশি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। বিভিন্ন প্রকার ফসলের উন্নত এবং প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, চাষাবাদ প্রযুক্তি আবিষ্কার, উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন এবং যান্ত্রিকীকরণ উৎসাহিত করতে ভর্তুকি প্রদান অব্যহত রয়েছে যা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে। ইতোমধ্যে ‘স্মার্ট কৃষিকার্ড ও ডিজিটাল কৃষি (পাইলট) প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ ও সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষি খাতে গত বছরের তুলনায় ৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা বা ৮.৩ শতাংশ বাড়তি বরাদ্দ করা হয়েছে যা দ্বিতীয় বৃহত্তম বরাদ্দ এবং মোট বাজেটের ৫.৯ শতাংশ। অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে শিল্পের প্রসার করা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে কর হারের পূনর্বিন্যাসের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে বিপুল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আবাসন ও নগরায়ণকে যুগোপযোগী করে তোলার মাধ্যমে সকলের জন্য স্বাস্থ্য সম্মত আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরে ও মহানগরে স্ট্রাকচার প্লান, মাস্টার প্লান, ডিটেইল্ড এরিয়া প্লান, ইত্যাদি করা হয়েছে। বস্তিবাসী ও নিম্নয়ায়ের মানুষদের আবাসন সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে ৪ হাজার ৩২টি ভাড়া ভিত্তিক আবাসিক ফ্লাট এবং ঢাকার শ্যামপুর-কদমতলী, নারায়ণগঞ্জের চনপাড়া এবং খুলনার হরিণঘাটা এলাকায় সাশ্রয়ী আবাসন নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ণৃ-গোষ্ঠী, ঘুর্ণিঝড়ে খতিগ্রস্থ পরিবারসহ আমাদের সরকারের সময়কালে ৫ লক্ষ ৭৮ হাজার ৩১২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ ‘অন্তর্ভুক্তিমুলক উন্নয়নের শেখ হাসিনা মডেল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশে জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ এবং নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বে জেন্ডার বৈষম্য সূচকে ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৫৯তম অবস্থান অর্জন করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটেও নারী উন্নয়নে ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
ইতোমধ্যে সরকারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক শতভাগ জনগণকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। ২০০৯ সালের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬ গুনের বেশি বৃদ্ধি করে বর্তমানে ৩০ হাজার ২৭৭ মেগাওয়াট করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে যার মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানী থেকে উৎপাদন করা হবে। বর্তমানের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হওয়ায় প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুতের জন্য বরাদ্দ ৪ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা কম ধরা হয়েছে। জ্বালানীর আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করার জন্য নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনের নিমিত্তে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৯টি কুপ খনন করা হয়েছে। ২০০৯ সালে আমাদের গ্যাসের উৎপাদন ছিল দৈনিক ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট যা বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। অধিকতর গ্যাস উত্তোলনের জন্য অগভীর সমুদ্রের ২৪টি ব্লকের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পিএসসি স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে।

সুনীল অর্থনীতি থেকে সম্পদ আহরণ এবং এর সুষ্ঠু ব্যবহারের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য এ বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রিয় বন্ধুগণ,
সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, ঢাকা মহানগরের যানজট নিরসনে দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ মোটরযান ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান আছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন মহাসড়কে ১ হাজার ৪৩৯টি সেতু নির্মাণ/পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। দেশজুড়ে ২২ হাজার ৪৭৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সুগঠিত মহাসড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত এবং ৮৫২ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক ৪-লেন এবং তদুর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ২০৪১ সাল নাগাদ ১২টি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং আরও ১০টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ঢাকা শহরে ৬টি মেট্রোরেলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। বিগত ১৫ বছরে দেশে ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ এবং ১ হাজার ৩৯১ কিলোমিটার পুরনো লাইনের সংস্কার করা হয়েছে। খুলনা হতে মোংলা লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে যা ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ে এবং উপ-আঞ্চলিক করিডোরের একটি বড় অংশ হিসেবে কাজ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেল লাইন নির্মানের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
২০০৯ সালে যখন আমরা সরকার গঠন করি তখনও আমরা ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির একটা অর্থনীতি পেয়েছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনার দক্ষতার গুণে পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে আমরা সে মূল্যস্ফীতি দমন করে জাতিকে স্থিতিশীল অর্থনীতি উপহার দিয়েছিলাম। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অংশের সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এবারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও আমরা সক্ষম হব বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এই বাজেটে মানুষের মৌলিক অধিকার, কৃষি, দেশীয় শিল্প ও সামাজিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যা দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করবে। করোনা অতিমারি থেকে শুরু করে চলমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট ডলার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও প্রতি বছরই বাংলাদেশ অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৫.২ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভারসাম্যমূলক বাজেটের কারণে মুদ্রাস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে এনে আগামী অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৭৫ শতাংশের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর