আজ ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

প্রেরণার লোকশিল্পী কবিয়াল রমেশ শীল


সৈয়দ শিবলী ছাদেক কফিল:

যে সব গুণীশিল্পী দেশের লোকশিল্পকে উজ্জীবিত করেছেন, শিল্পকে প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে কবিয়াল রমেশ শীল অন্যতম। সেই কবিয়াল সম্রাট রমেশ শীলের আজ রবিবার (৬ এপ্রিল) ৫৮তম মৃত্যুবার্ষিকী।

রমেশ শীল ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে, ১৩৭৩ বঙ্গাব্দের ২৩ চৈত্র চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার গোমদন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম চন্ডীচরণ শীল। চন্ডীচরণ শীল ছিলেন পেশায় নরসুন্দর ও কবিরাজ। রমেশ শীলের স্কুলজীবন ৪র্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে পিতার মৃত্যুর পর লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যায় ও পরিবারের সকল দায়িত্ব আসে তাঁর কাঁধে।

তারপর তিনি পিতার পেশাতে গমন করেন। পরবর্তীতে তিনি বার্মার রেঙ্গুন শহরে গমন করেন। সেখানে একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে একটি দোকানেরও মালিক হন। কিন্তু স্বদেশের প্রতি ভালবাসার দরুন পাঁচ বছরের মধ্যেই নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামে এসে তিনি পূর্বের নরসুন্দর কাজের পাশাপাশি কবিরাজ হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই কবিরাজি করতে করতেই কবিগানের প্রতি ভীষণ ভাবে অনুরাগী হয়ে উঠেন তিনি।

কোনরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১৮৯৭ সালে প্রথম মঞ্চে কবিগান পরিবেশন করেন এবং সমাদৃত হন। ১৮৯৯ সালে কবিগান পরিবেশনায় প্রতিদ্বন্দ্বী তিনজন কবিয়ালকে পরাজিত করলে উদ্যোক্তা ও শ্রোতাকূলের কাছ থেকে মোট তের টাকা সন্মানী লাভ করেন, যা পেশা হিসেবে পরবর্তীতে কবিগানকে বেছে নিতে অনুপ্রানিত করে রমেশ শীলকে।

বঙ্গাব্দ ১৯৩৮ সালে কবিগানের ইতিহাসে প্রথম কবিয়াল সমিতি গঠিত হয় রমেশ শীলের উদ্যোগে। কবিয়ালদের এই সমিতির নাম রাখা হয় ‘রমেশ উদ্বোধন কবি সংঘ’। অশ্লীলতা মুক্ত কবিগান ছিল এ সমিতির অন্যতম লক্ষ্য। ১৯৪৪ সালে কবি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে কবিকে সম্বর্ধিত ও ‘বঙ্গের শ্রেষ্ঠতম কবিয়াল’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জোরাল অবস্থান নিয়েছিলেন। যে কারণে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দেওয়ার পরে অন্যান্য নেতা-কর্মীর সাথে রমেশ শীলকেও গ্রেফতার করা হয়। তার ‘ভোট রহস্য’ পুস্তিকাটি বাজেয়াপ্ত করে কেন্দ্রীয় সরকার। কবি দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন এসময়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরধিতা করায় রমেশ শীলের সাহিত্য ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেষ জীবনে কবি নিদারুণ অর্থ কষ্টের সম্মুখিন হন। কবির প্রথম স্ত্রী ছিলেন অপূর্ববালা, এবং দ্বিতীয় স্ত্রী অবলাবালা। কবির চার পুত্র ও এক কন্যা জন্মলাভ করে এ সংসারে।

সাধারণ কবিয়ালদের মত রমেশ শীল পুরাণ ও কিংবদন্তী নির্ভর গান চর্চা করতেন। তখন তার গানের বিষয় ছিল নারী-পুরুষ, সত্য-মিথ্যা, গুরু-শিষ্য, সাধু-গেরস্থ ইত্যাদি কেন্দ্রিক। পরবর্তী কালে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত কবি প্রবলভাবে সমাজ সচেতন হয়ে ওঠেন। কবিগানের বিষয়বস্তুতে আসে আমূল পরিবর্তন। যুদ্ধ-শান্তি, চাষী-কমিদার, স্বৈরতন্ত্র-গনতন্ত্র, এসব হয়ে যায় কবিগানের উপজীব্য। মাইজভান্ডারী তরীকার আধ্যাত্মিক গানের অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি।
খ্রিস্টাব্দ ১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজার মাঝিরঘাটে দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে কবিগানের আয়োজন করা হয়। প্রায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষের উপস্থিতিতে কবিগান শুরু হয়। প্রধান কবিয়াল ছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় কবিয়াল মোহনবাঁশী ও চিন্তাহরণ। কিন্তু গানের আসরে চিন্তাহরণ অসুস্থ হয়ে পড়েন । এতে শ্রোতারা হট্টগোল শুরু করেন। তখন আয়োজকরা কবিয়াল দীনবন্ধু মিত্রকে মঞ্চে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু কবিয়াল দীনবন্ধু মিত্র তাদের অনুরোধ গ্রহণ না করে রমেশ শীলকে মঞ্চে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। প্রথমে ভয় পেলেও পরে মঞ্চে উঠে যান রমেশ শীল। মাত্র একুশ বছর বয়সের রমেশ শীলকে প্রতিপক্ষের কবিয়াল মোহনবাঁশি অবজ্ঞা করে বলেছিলেন, “এই পুঁচকের সাথে কি পালা করা যায় ?” প্রত্যুত্তরে রমেশ শীল বলেছিলেন- “উৎসব আর ভয় লজ্জা কম নয়। কে বা হারাতে পারে কারে। /পুঁচকে ছেলে সত্যি মানি শিশু ব্রজ ছিল জ্ঞানী/ নাচেনাজানা হোক না আসরে।” ঐ আসরে তিনি দর্শকদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছিলেন, “মা আমার রাজকুমারী চন্ডীচরণ বাপ, আমি হইরে মানুষের বাচ্চা করবো না রে মাফ। “জীবনের প্রথম আসরে টানা আট ঘণ্টা গেয়েছিলেন কবিগান। ঐ আসরে কেউ কাউকে হারাতে পারেনি। অবশেষে আয়োজকদের হস্তক্ষেপে কবিগান বন্ধ হয় সেদিনের মত। তবে তখন থেকেই রমেশ শীলের জনপিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ।

ঐতিহ্যের কবিগানের ভাষা ও পরিবেশনা থেকে অশ্লীলতা বিসর্জনে কবি ছিলেন সদা সতেষ্ট। স্থুল অঙ্গভঙ্গি ও কুরুচিপূর্ণ শব্দযোগে যৌনতার পরিবেশন ছিল কবিগানে আসল আকর্ষণ। রমেশ শীলের শৈল্পিক উপস্থাপন ও মার্জিত শব্দচয়ন কবিগানে রুচিশীলতার এক বিরল দৃষ্টান্ত। দেশাত্মবোধ, দূর্ভিক্ষ-মন্তর,
উপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলন তাঁর গানের ভাষায় উঠে এসেছে জোরালোভাবে। যেমন- ‘ব্যবসার ছলে বণিক এল/ ডাকাত সেজে লুট করিল/ মালকোঠার ধন হরে নিল- আমারে সাজায়ে বোকা; / কৃষক মজদুর একযোগেতে/ হাত মেলালে হাতে হাতে/ শ্বেতাঙ্গ দোশমনের হতে- যাবে জীবন রাখা’। অথবা- ‘দেশ জ্বলে যায় দুর্ভিক্ষের আগুনে/ এখনো লোকে জাগিল না কেনে’। “বাংলার জন্য জীবন গেলে হব স্বর্গবাসি/ আমার বাংলার দাবি ঠিক থাকিবে যদিও হয় ফাঁসি”- কবির দেশাত্মবোধ ছিল গভীরতর।

অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত কবিয়াল রমেশ শীল সক্রিয় ভাবে অংশ নেন। তার গণসঙ্গীত দেশের মানুষদের এই সব সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ১৯৫৪ সালে জণগণের ভোটে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং নুরুল আমিনকে পূর্ববাংলার গভর্নর বানানো হয়। এই নুরুল আমীন চট্টগ্রামে এলে জনগণের কাছে লাঞ্চিত হন। এই নিয়ে তিনি বিখাত একটি ব্যাঙ্গাত্মক গান রচনা করেন। গানটি হচ্ছে,
“শোন ভাই আজগবি খবর
মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন করে চট্টগ্রাম সফর।
দিনের তিনটা বেজে গেল পল্টনে সভা বসিল
হায় কি দেখিলাম কি ঘটিল।
মানুষ ভয়ে জড়সড়
হঠাৎ দেখি পচা আন্ডা
মন্ত্রীকে করিতেছে ঠান্ডা।
উড়তে লাগলো কাল ঝান্ডা,
মন্ত্রীর চোখের উপর।
বিপ্লবী চট্টগ্রাম গেলা সূর্যসেনের প্রধান কেল্লা
মন্ত্রী করে তৌব্বা তিল্লা,
করবো না জনমভরে চট্টগ্রাম শহর।”
এই গানটি এতো জনপ্রিয় পেয়েছিল যে, তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই জন্য তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। কারাগারে তিনি এক বছর ছিলেন। এই সময় তার বয়স হয়েছিল সত্তর বছর এবং তাকে প্রচুর মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। সেই সময় তাকে অঢেল বিত্তবৈভবের লোভ দেখিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত লেখার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখান করেন। এই প্রলোভনের জবাব দিয়েছিলেন তিনি নিচের কবিতা দিয়ে,
“আমার খুনে যারা করেছে মিনার
রক্তমাংস খেয়ে করেছে কঙ্কালসার
আজ সেই সময় নাই ত্বরা ছুটে আসো ভাই
বেদনা প্রতিকারের সময় এসেছে।”
কবিয়াল রমেশ শীল রচিত বইগুলোর মধ্যে “আশেকমালা”, শান্তিভান্ডার, নুরে দুনিয়া, দেশের গান, ভোট রহস্য, চট্টল পরিচয়, ভান্ডারে মওলা, জীবন সাথী, মুক্তির দরবার, মানব বন্ধু, চাটগায়ের পল্লিগীতি ১ম ও ২য় ভাগ ইত্যাদি অন্যতম। জানা যায়- উল্লেখিত বই এছাড়াও তাঁর রচিত আরো কিছু পুস্তক তালিকার বাইরে রয়েছে। যেমন- (১) পাকিস্তান সঙ্গীত (২) দেশ দরদী গানের বই (৩) লোক কল্যাণ (৪) ১৩৬৭ সালের তুফানের কবিতা (৫) এসেক সিরাজিয়া (৬) মহাকাব্য বহি (৭) ১৯৬৩ সালের তুফানের কবিতা (৮) শান্তির কবিতা । এছাড়াও রমেশ শীল বেদুঈন ছদ্মনামের “বদলতি জমানা” শীর্ষক এবং ঋষিভত্ত ছদ্মনামের “ভন্ড সাধুর” কবিতা শীর্ষক দু’টি পুস্তক প্রকাশ করে ছিলেন। তার অন্যান্য প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে, নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী সহযোগে “গান্ধী হত্যার কবিতা”। এসব বইয়ের বাইরেও রমেশ শীলের প্রায় দেঢ়’শ এর বেশী কবিতা রয়েছে।

কবিয়াল রমেশ শীল ২৩ চৈত্র ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ, ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

লোককবি রমেশ শীল জীবনের শেষ দুই দশকে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মানিত হন। তবে তাঁর দীর্ঘ কবিয়াল জীবন, অজস্র রচনা, সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের জন্য সেটি নিতান্তই অপ্রতুল। কয়েক বছর আগে দারুল ইরফান রিচার্স ইনস্টিটিউট (উওজও) কর্তৃক সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারী গোল্ড মেডেল (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ১৯৫৮ সালের ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে সহবন্দীদের আয়োজনে জন্মদিনের সংবর্ধনা, ১৯৬২ সালের ঢাকার বুলবুল একাডেমি সংবর্ধনা, ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামের নাগরিক সংবর্ধনা। বোয়ালখালী উপজেলা প্রশাসন সম্মাননা করা হয়। ২০০২ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেয়া হয়।

লোকশিল্পের ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক সমাজ সচেতনতার সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাইজভান্ডারী গানের কিংবদন্তি সাধক।

লেখক: (সৈয়দ শিবলী ছাদেক কফিল) একজন সাংবাদিক ও ছড়াকার।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর