করোনাকালে শিক্ষকদের মানবেতর জীবন-যাপন

আফছার উদ্দিন লিটন    ০৬:৩৯ পিএম, ২০২১-০৬-০৫    148


করোনাকালে শিক্ষকদের মানবেতর জীবন-যাপন

করোনার কারণে প্রায় ১৫ মাস হলো স্কুল বন্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এতো দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার নজির নেই। একমাত্র মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে তা সম্ভব হয়েছে। করোনায় ভালো নেই শিক্ষার্থী। ভালো নেই শিশুরা। তারা সবাই এখন ঘরবন্দি। করোনা তাদেরকে মানসিকভাবে আঘাত করছে। ভেঙ্গে দিচ্ছে তাদের চঞ্চল মনকে। একই অবস্থা শিক্ষকদের ক্ষেত্রে; তারাও এর বাইরে নয়। করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নন-এমপিওভূক্ত বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বেতন না পাওয়ায় খুবই বেকায়দায় আছেন। জাতির বিবেক এবং মানুষ গড়ার কারিগড়রা আজ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কেউ কেউ স্কুলের চাকরি ছেড়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। কেউ কেউ স্কুলের চাকরি ছেড়ে গ্রামরে বাড়ি চলে যান।কেউ কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাতে অক্ষম হওয়ায় স্কুল বিক্রির নোটিশ দিয়ে তাদের অসহায়ত্বের কথা সরকারকে জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ স্কুল রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। কোনো কোনো কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও পরিচালকরা স্কুলের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দিয়ে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছেন। 

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তানে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে স্কুল খোলা ছিলো। এর আগে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটানে স্কুল-কলেজ খোলা ছিল। তবে, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের অবস্থান এখন ভালো নয়। ভারতে করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। থেমে নেই মৃত্যু। সেখানে এখন লাশ আর লাশ। তাই, ভারতে বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে সরকার বাধ্য। তবে, করোনার প্রথম ঢেউ স্বাভাবিক হলে ইউরোপ,আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হয়েছিল। এইতো কিছুদিন আগে ইউকে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার করোনার নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। ইউরোপ,আমেরিকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা আবার বাড়লেও ওইসব দেশের সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করেছে। অঞ্চলভিত্তিক হালকা-পাতলা লকডাউন দিলেও তা আবার অল্প কিছুদিনের মধ্যে তুলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে দিয়েছে। ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানির সব স্কুল খোলা। কাজেই সরকারের উচিত হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর বন্ধ না রেখে খুলে দেয়া।  অভিভাবকরাও তা চাইছেন। অভিভাবকরা  চাইছেন সরকার যেন স্কুল খোলার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন। কেননা প্রাথমিক স্কুলের শহরের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রায় এক বছর ঘর বন্দি থাকায় রোবট হয়ে যাচ্ছে। হতাশ হচ্ছে। মুখ গোমরামুখী করে রাখছে। অনেক শিশুই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। অনেক অভিভাবক বাচ্ছাদের আগে মোবাইল হাতে না দিলেও করোনাকালীন সময়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, কতদিন তাদের দমিয়ে রাখা যায়। অনেক দিন তো হলো। আর স্কুলের অনলাইন ক্লাসের জন্য এখন মোবাইল, ল্যাপটপ এগুলো লাগে। 

দেশে বাংলা ও ইংরেজি দুই মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলে মূলত প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা করা হলেও অনেক স্কুলে মাধ্যমিক স্তরও আছে। দেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুল কতগুলো আছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব সরকারের হাতে নেই। বাংলাদেশ  শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর(ব্যানবেইস) হিসাবে স রকারি, কিন্ডারগার্টেন, এনজিওর স্কুলসহ প্রাথমিক স্কুল ১ লাখ ২৯ হাজারের মতো। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক স্কুল আছে ৬৭ হাজারের মতো। প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি। তবে, কিন্ডারগার্টেনগুলোর সমিতির তথ্য অনুসারে সারাদেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে ৪০ হাজারের মতো। একেকটি স্কুলে গড়ে ১০০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত শিক্ষার্থী পড়ে। শিক্ষার্থী প্রায় ৫০ লাখ। অবশ্য এসব শিক্ষার্থীদের একটি অংশ একই সঙ্গে মূলধারার স্কুলেও পড়ে। আবার অধিক যত্নের জন্য কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। মোট শিক্ষক আছেন প্রায় ১০ লাখ। জাতীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ঐক্য পরিষদ এবং বাংলাদেশ কিন্ডাগার্টেন স্কুল-কলেজ এসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশে এ রকম প্রতিষ্ঠান আছে ৬৫ হাজারের মতো। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ১২ লাখ। শিক্ষার্থী আছেন প্রায় ২ কোটি। আর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী আছে প্রায় এক কোটি।

করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ২২ মে পর্যন্ত ছুটি ছিল। তা এখন বর্ধিত করে ২৯ মে করা হয়েছে।দীর্ঘ এই বন্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্ডারগার্টেনের মতো অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও করেনাভাইরাসের এ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। কিন্ডারগার্টেনগুলোর বিরাটসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা  আছেন সংকটে। কিন্ডাগার্টেনগুলোর প্রায় ৯৯ ভাগ ভাড়াবাড়িতে চলে। স্কুলগুলোর আয়ের উৎস টিউশন ফি।  বন্ধরে কারণে গত বছররে মার্চ থেকে টউিশন ফি আদায় করেতে সমস্যা হচ্ছে ।অনেক অভিভাবক স্কুল বন্ধ থাকার কারণে সন্তানদের বেতন দিতে চাইনা। অবশ্য তাদের বেতন না দেয়ার পেছনে অনেক যুক্তি রয়েছে। এ কারণে ভাড়াবাড়ি ও শিক্ষকদের বেতন দিতে গিয়ে সংকটে পড়ছেন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তরা। শুধু তাই নয়, এক হাজাররে মতো স্কুল একবোরইে বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে নানা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু খুলতে দেরি হওয়ায় সংকট আরো বাড়ছে। তাদের মতে স্কুল খোলার বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিস্কার নয়। সরকার কি করতে চাচ্ছে তা বুঝে উঠতে পারছে না তারা। এক্ষেত্রে সরকার পুরাই উদাসীন।

দেশে করোনা সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দিন আবারও পেছানো হয়েছে। আগামী ঈদুল ফিতরের পর ২৩ মে থেকে স্কুল ও কলেজে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর সিদ্ধান্ত নিলেও তা থেকে সরে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী ২৯ মে পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী।  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায়, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়েই স্কুল খোলার সময় পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত রয়েছেন। যেহেতু করোনা সংক্রমণ বাড়ছে তাই এই মুহূর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাই না।

এর আগে সরকার ৩০ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২৪ মে থেকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর কথা রয়েছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ  থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পরে কওমি মাদরাসাগুলো খোলার অনুমতি দেয়া হলেও অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলার অনুমতি দেয়নি সরকার। সর্বশেষ ২৯ মার্চের পর ২২ মে পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরে তা বর্ধিত করে তা হয় ২৯ মে। এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে ২০২০ সালের জেএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এছাড়া কোনো শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সব শিক্ষার্থীকে অটোপাস দেয়া হয়েছে।

গত বছর শীতের  শেষে  মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার কথা থাকলেও তা যথাসময়ে হয়নি। চলতি বছরের মার্চ থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানে। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের টিকা চলে আসায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে বলে সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২১ সালের প্রথম দিকে গণসাক্ষরতা অভিযান সারাদেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক , শিক্ষা কর্মকর্তাসহ প্রায় ৩ হাজার জনের ওপর জরিপ পরিচালনা করে দেখেছে যে প্রায়  ৬৯% শিক্ষার্থী করোনাকালে দূর-শিক্ষণে অংশ নিতে পারেনি। শিক্ষার এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্কুলগুলো দ্রুত খুলে দিয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আওতায় শ্রেণি শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। সমস্ত  প্রস্তুতি নিয়ে ধাপে ধাপে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করার জন্য যতো দ্রুত সম্ভব ঘোষণা করা প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা প্রশাসন ও বেসরকারি সংগঠনকে যুক্ত করে প্রস্তুতি নিতে হবে, সেই ব্যবস্থা মনিটরিং করতে হবে। সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্কুলগুলো খোলার ব্যবস্থা করার কথাও বলেছিলেন তিনি।

শিক্ষকতা পৃথিবীর সবচেয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী পেশা। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব এবং গবেষণায় প্রমাণিত। ২০১৯ সালের শিক্ষক মঙ্গল সূচক অনুযায়ী ৭২ শতাংশ শিক্ষক মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করেন। ৭৮ শতাংশ শিক্ষকের মধ্যে কোনো না কোনো আচরণগত, মানসিক বা শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। জাতি গঠনে এরূপ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের প্রকৃত  মর্যাদা কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? যুক্তরাজ্যের এক সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটেছে, যা আমাদের শিক্ষকদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। শিক্ষক যদি ঠিক না থাকেন, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও ঠিক থাকবে না। এ কারণে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় শিক্ষকদের মানসিক অবস্থার উন্নতিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। (শিক্ষকদের করোনাকালীন দুর্দশা লাঘবে করণীয়, যুগান্তর ১২ জুলাই ২০২০)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার পদক্ষেপ জরুরি? প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের চেয়ে উত্তম কিছু নেই। জাতি গড়ার সুনিপুণ কারিগর এই শিক্ষকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমেরিকার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হেনরি এডামস বলেছিলেন, ‘একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলে, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়।’ ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারবিষয়ক সম্মেলনে সমাজের প্রতি শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের বেতন, পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তাসহ সব সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিক সময়ের মতো যে কোনো দুর্যোগেও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত আমাদের দেশের শিক্ষকদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। ভগ্ন কুটির, অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে শীর্ণ দেহে শিক্ষার আলো ছড়ানোয় ব্যস্ত শিক্ষক সমাজের এই চিত্র ছিল স্বাভাবিক বিষয়। এজন্যই আশরাফ সিদ্দিকী তার ‘তালেব মাস্টার’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি যেন সেই ভাগ্যাহত বাতিওয়ালা/ পথে পথে আলো দিয়ে বেড়াই/ কিন্তু নিজের জীবনেই অন্ধকার মালা।’

জাতীয় প্রেক্লাবের সামনে জাতীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ঐক্য পরিষদ এবং বাংলাদেশ কিন্ডাগার্টেন স্কুল-কলেজ এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আর্থিক প্রণোদনা, বার্ষিক মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন শিক্ষকেরা। মানববন্ধনে জাতীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ঐক্য পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবি গুলো ছিলো বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতির দুর্যোগকালে কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের উদ্যোক্তা ঘোষণার মাধ্যমে আর্থিক প্রণোদনা কিংবা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা, ২০২১ সালের ভর্তির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান এবং বার্ষিক মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ দেয়া।

কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজের উদ্যোক্তাদের দাবি, দেশের অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ নিজস্ব অর্থায়নে ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হয়। একই অবস্থা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। সারাদেশে এ রকম প্রতিষ্ঠান আছে ৬৫ হাজারের মতো। এতে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষক কর্মচারী নিয়োজিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণভাবে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত টিউশন ফি দ্বারা পরিচালিত হয়। করোনাভাইরাসের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আগেই উল্লেখ করেছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ১৫ মাস হলেও আর খোলেনি সরকার।  আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িওয়ালার বাড়িভাড়ার টাকাও দিতে পারছে না তারা। এমনকি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনও দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারো কারো বাড়িওয়ালার ভাড়া বকেয়া রয়েছে এক বছর, কারো কারো ছয় মাস, কারো কারো তিন মাস। বাড়িওয়ালারা ভাড়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। লাখো শিক্ষক, কর্মচারী ও পরিচালক বেকার হয়ে যাবেন। 

করোনায় বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দয়োর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদ। এ নিয়ে সাবকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মােতাহার হোসেন ও সোলায়মান হক জোর্য়াদ্দার বলেন, করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ভার্চুয়াল ক্লাস হলেও গ্রামরে শিক্ষার্থীরা এতে খুব বেশি উপকৃত হতে পারছে না। যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দয়ো হোক।এর আগে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন ঢাকার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এ ব্যাপারে গত ১১ই জানুয়ারি সরকারকে পাঠানো আইনি নোটিশে বলা হয়, দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তাই ছুটি না বাড়িয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হোক।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত ১৭ই মার্চ থেকে স্কুল, কলেজসহ সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার, যা আজ অবধি চালু হয়নি। এরই মধ্যে বাতিল হয়েছে পিএসসি, জেএসসি, এইচএসসি এবং সব শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা। ক্লাস-পরীক্ষা। ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ থেকে থেকে স্কুলগুলোয় কোন ক্লাস-পরীক্ষা চলছে না। এই দীর্ঘ সময় অনলাইন ও সংসদ টিভিতে ক্লাস চললেও ডিভাইস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় ৬৮% শিক্ষার্থীর কাছে সেই সেবা পৌঁছায়নি। গণস্বাক্ষরতা অভিযানের সাম্প্রতিক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে থাকার কারণে এখন ৭৫% শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৭৬% অভিভাবক চাইছেন স্কুলগুলো স্কুলে দেয়া হোক। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চে থেকে সীমিত পরিসরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল  সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন প্রক্রিয়ায় খোলা হবে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কী ধরণের ব্যবস্থা নেয়া  হবে, সে বিষয়েও শিক্ষার দায়িত্বে থাকা দুই মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা বারবার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে তা আর ফলপ্রসূ হয়নি।

কাজেই সরকারের উচিত হবে আগে প্রাইমারি এবং মাধ্যমিক স্কুলগুলো খুলে দেয়া। এরপর করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সংক্রমণের হার কমে আসলে  কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা খুলে দেয়া। অনলাইনের ক্লাস আর স্বাভাবিক ক্লাস এক না। শিশুরা অনলাইন ক্লাসে একধরনের একঘেয়েমিভাব প্রকাশ করে। কিন্তু স্বাভাবিক ক্লাসে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এছাড়া অনলাইন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সঠিক মূল্যায়ন হয়না। শিশুদের কোমল কচি হৃদয় ধ্বংস হওয়ার আগে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খুলে দেয়া হোক। প্রয়োজনে সেটা প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরেও হতে পারে। শিশুরা মুক্ত হাওয়ায় বেড়ে উঠোক। পাঠশালায় ফিরে যাক। অন্তত মানসিকভাবে বিপর্যয় হওয়ার আগে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করার অধিকার ফিরে পাবে।

---লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক



রিটেলেড নিউজ

প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক সহ ২ কর্মকর্তাকে শোকজ

প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক সহ ২ কর্মকর্তাকে শোকজ

অনলাইন ডেস্কঃ

বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ও ভেতরে ময়লা-আবর্জনা থাকায় দুই কর্মকর্তা ও একজন প্রধান শিক্ষককে শোকজ করা ... বিস্তারিত

বিমানের সেই পাইলট ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’

বিমানের সেই পাইলট ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’

অনলাইন ডেস্কঃ

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট মধ্য আকাশে থাকার সময় হার্ট অ্যাটাক করা পাইলট ক্যাপ্টেন ... বিস্তারিত

দূরীভূত হচ্ছে ভ্যাকসিন রাজনীতি

দূরীভূত হচ্ছে ভ্যাকসিন রাজনীতি

আফছার উদ্দিন লিটন

করোনার থাবায় বিপর্যস্ত দেশগুলো অনেক আগেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশ এখনো ... বিস্তারিত

করোনায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রুগ্ন অবস্থা

করোনায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রুগ্ন অবস্থা

আফছার উদ্দিন লিটন

দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে; সেই সঙ্গে বাড়ছে শঙ্কা। করোনার নতুন নতুন ... বিস্তারিত

লকডাউনের বিকল্প মাস্কের ব্যবহারে জোরদার

লকডাউনের বিকল্প মাস্কের ব্যবহারে জোরদার

আফছার উদ্দিন লিটন

করোনা সমগ্র বিশ্বকে থমকে দিয়েছে। মানুষকে কর্মহীন করেছে। করোনায় বেড়েছে দারিদ্র। করোনায় ... বিস্তারিত

বাস চলাচল নিয়ে বিআরটিএ’র নতুন নির্দেশনা

বাস চলাচল নিয়ে বিআরটিএ’র নতুন নির্দেশনা

অনলাইন ডেস্কঃ

দেশে আগামীকাল বুধবার (১১ জুলাই) থেকে লকডাউন শিথিল করায় চলাচল করবে সব ধরনের গণপরিবহন। তবে করোনা ... বিস্তারিত

সর্বশেষ

মাইজভান্ডার জেয়ারতে চসিক চকবাজার ওয়ার্ড উপনির্বাচনে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হাজী মুহাম্মদ সেলিম রহমান

মাইজভান্ডার জেয়ারতে চসিক চকবাজার ওয়ার্ড উপনির্বাচনে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হাজী মুহাম্মদ সেলিম রহমান

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার শরীফ জেয়ারতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ১৬ নং চকবাজার ওয়ার্ড ... বিস্তারিত

সাতকানিয়ার মাদক কারবারি ৬০০০ ইয়াবা নিয়ে লোহাগাড়ায় আটক

সাতকানিয়ার মাদক কারবারি ৬০০০ ইয়াবা নিয়ে লোহাগাড়ায় আটক

মোঃ সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রামঃ

দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ছয় হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ এক মাদক কারবারি আটক করেছে পুলিশ। ... বিস্তারিত

বাংলাদেশ অটোরিক্সা শ্রমিকলীগের আলোচনা সভা

বাংলাদেশ অটোরিক্সা শ্রমিকলীগের আলোচনা সভা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

বাংলাদেশ অটোরিক্সা শ্রমিকলীগ চট্টগ্রাম মহানগর কার্যকরি কমিটির এক জরুরী আলোচনা সভা সম্প্রতি ... বিস্তারিত

লোহাগাড়ায় ৬০০০ ইয়াবাসহ ১ যুবক পুলিশের হাতে আটক

লোহাগাড়ায় ৬০০০ ইয়াবাসহ ১ যুবক পুলিশের হাতে আটক

মোঃ সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রামঃ

লোহাগাড়ায় ৬ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ জুনাইদ (৩০) নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ১৩ সেপ্টেম্বর ... বিস্তারিত