ধর্ষণ : কেন মানুষের এই নৈতিক অবক্ষয়?

আফছার উদ্দিন লিটন    ০৬:২৭ পিএম, ২০২১-০২-১৭    47


ধর্ষণ : কেন মানুষের এই নৈতিক অবক্ষয়?

ধর্ষণ। বর্তমানে এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। সমাজের মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত ধর্ষণের ঘটনা দেশকে অস্থির করে তুলেছে। সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে নারীকে গণধর্ষণ, সিলেটে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে কেড়ে নিয়ে জোড়পূর্বক গণধর্ষণ, নোয়াখালীতে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ। এর আগে, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সাংসদ একরামুল হকের লোকজন গৃহবধুকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করে। এ ধরনের অজস্র ধর্ষণের ঘটনা দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। 

ধর্ষণের শিকার থেকে পাঁচ বছরের শিশু কন্যা ও শত বছরের বৃদ্ধা আজ কেউ নিরাপদ নয়। এমনকি বোবা শিশু, অন্ধ যুবতী, রাস্তার পাগলীও রেহায় পাচ্ছে না পাষণ্ড ধর্ষকদের হাত থেকে। হুজুগে বাঙালির দেশে একটির পর একটি ঘটনা লেগেই থাকে। কখনো ছেলে ধরা গুজবে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা। কখনো ভিক্ষুককে চোর বলে পিটিয়ে হত্যা করা, কখনো সিলেটের রাজনদের মতো অসহায় শিশুদের চোর অপবাদে নৃশংসভাবে  পিটিয়ে হত্যা করা। যা মানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চলছে। সত্যিই মানবাধিকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। মানুষের মুখে এখন মানবাধিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আসলে কি দেশে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার আছে? 

শুধু তাই নয়। এর পর আরও নতুন ঘটনা আসলো আর গেলো। কাজের কাজ কিছু হয় না। এক একটা গুজবের অজুহাতে এক একটা বিষয় ধামাচাপা পড়ে যায়। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে আসলো ক্যাসিনো কান্ড। ক্যাসিনো কান্ড নিয়ে জি.কে শামীম, সম্রাট, খালেদ ও পাপিয়াদের আন্ডারগ্রাউন্ডের কাজকর্ম দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়। এ নিয়ে অনেকদিন হৈ-চৈ চলে। এ ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য পিঁয়াজ নিয়ে কাহিনী শুরু হয়। এক প্রকার বলতে গেলে পিঁয়াজের ঝাঁঝে ক্যাসিনো কান্ড ধামাচাপা পড়ে যায়।  এরপর আসলো প্রধানপ্রতি এস.কে সিনহার ঘটনা। তাও ধামাচাপা পড়ে যায়। এরপর আসে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে চিনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয় চলতি বছরের ৮ মার্চ। করোনায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রুগ্ন অবস্থা ফুটে উঠার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যখাতের ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠে। আবারও আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারক শাহেদ এবং জে.কে.জি গ্র“পের ডা. সাবরিনার করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ভুয়া সনদ দেয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হন।  

দেশে করোনা পরিস্থিতি যখন একটু উন্নতির দিকে তখন আলোচনায় আসে সাবেক মেজর সিনহা হত্যাকান্ড। যার নেপথ্য কুশিলব ওসি প্রদীপ এবং এস.আই লিয়াকত। এ কাহিনী বেশকিছু দিন আলোচনায় থাকে মানুষের কাছে। গণমাধ্যমে এটিকে ফলাও করে সংবাদ প্রচার করে। এবার এ কাহিনীও ধামাচাপা পড়ে যায় দেশে হঠাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায়। 

বিগত কয়েক বছর ধরে সারাদেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা রেশ থাকলেও তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়  চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে। যার কারণে বাম রাজনীতির আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষ। ধর্ষণের আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে যায়। আন্দোলনে দেশে প্রচলিত যে ধর্ষণ আইন রয়েছে তা সংশোধন করে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবিতে। অবশেষে দেশের সমাজ সচেতন তথা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সফল হয়েছে। সরকার ধর্ষণ আইন সংশোধন করতে সম্মত হয়। ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনটি গেজেট আকারে পাশ করে সরকার। ধর্ষণ অনেক কারণে হতে পারে। আইন-শৃংখলা অবনতির কারণেও হতে পারে। আবার বিচারহীনতার সং®কৃতির কারণেও হতে পারে। তবে দেশে বিগত কয়েক বছরে যতোগুলো ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এর অধিকাংশ ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত। ধর্ষকদের তালিকায় রয়েছে ধনির বকে যাওয়া সন্তান, মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী। রয়েছে নিরক্ষর প্রকৃতির লোক। রয়েছে পরিবহন শ্রমিকরাও। সরকারি-বেসরকারী বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে রাজনীতিক নেতারা ধর্ষণ করছে বেশি। ধর্ষকের তালিকায় রয়েছে স্কুলের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যাপক,  কলেজের অধ্যক্ষ, মাদ্রাসার শিক্ষক ও অধ্যক্ষ, পুরোহিত, ডাক্তার, এডভোকেট, পুলিশ, ইউপি চেয়ারম্যান প্রমুখ।

নারী নির্যাতনের এক জঘন্যতম প্রকাশ হচ্ছে ধর্ষণ। এটি অন্য দশটি অপরাধের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন।

সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার সময় ষাটোর্ধ নাসিম বানু ময়মসিংহের হালুয়াঘাট নাগলা থেকে চট্টগ্রাম যাত্রার উদ্দেশ্যে বাসে ওঠে। তার পরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টার সময় বাসটি যখন সীতাকুন্ড, মিরসরাই, নেমে যাওয়ায় বাসের চালক এবং হেলপার বয়ষ্ক নাসিম বানুকে জোর জবরদস্তিমূলক শ্লীতাহানীর চেষ্টা করে। এ.কে. খান মোড়ের কাছাকাছি যখন বাস চলে আসে সেদিন ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। বাসটি এ.কে. খান মোড়ের কাছাকাছি যখন আসে তখন বাসের অন্য যাত্রীরা সিতাকুন্ড, মিরেরসরাই নেমে যাওয়ায় বাসের চালক এবং হেলপার একজন বয়ষ্ক মহিলাকে জোর জবরদস্তিমূলক শ্লীতাহানী করার চেষ্টা করে। সেদিন চালক ঐ বয়স্ক মহিলাকে বাসে একা পেয়ে তার সকল কাপড়-চোপড় খুলে বিবস্ত্র হওয়ার কথা বলেন। সেদিন নাসিম বানু ও তার আত্মীয় স্বজন রাত ৮টার সময় অলংকার ইউনাইটেড বাস কাউন্টারে গিয়ে মাদকাসক্ত বাসের চালক ও হেলপারকে চিহ্নিত করেছে। এরপর স্থানীয় জনগণ ওই বাসের চালক ও হেলপারকে গণধোলাই দিয়ে সতর্ক করে দেন।

এরপর বাসের হেলপার ওই মহিলাকে তার কাছে টাকা পাই বলে পিছনে যেতে বলে। কিন্তু নাসিম বানু একটুও ভিত সন্ত্রস্ত হয়নি। দমে যায়নি। বুকে সাহস রেখে নাসিম বানু ওই বাসের চালক ও হেলপারের সাথে নিজের মান সম্মান রক্ষার্থে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কোনোরকমে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পায়। বৃদ্ধা মহিলাটি ওই বাসের চালক ও হেলপারের সাথে ধস্তাধস্তি করে কোনো রকমে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে প্রতিনিয়ত বাসে নারীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। বাসের চালক ও হেলপার নারীদের শ্লীতাহানী করছে। এমনকি বাসে নারীদের নিরাপত্তা না থাকায় নারীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। এক কথায় নারী আজ শুধু বাস কেন অন্যান্য যানবাহনেও নিরাপদ নয়। 

আশার কথা হলো সরকার ধর্ষকদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনটি পাশ করে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে ধর্ষকরা শাস্তি পাবেই। শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ কমে আসবে। এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন। তারা ধর্ষণের বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করছে।

লেখক ও সাংবাদিক

afsaruddin4812@gmail.com



রিটেলেড নিউজ

শীঘ্রই ৪টি মেরিন একাডেমি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

শীঘ্রই ৪টি মেরিন একাডেমি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

চাটগাঁর সংবাদ অনলাইন ডেস্ক:

শীঘ্রই রংপুর, বরিশাল, সিলেট ও পাবনা মেরিন একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ... বিস্তারিত

চলে গেলেন বরেণ্য অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান