হায় মৃত্যু! তুমিই সত্য আর কিছু না

চাটগাঁর সংবাদ অনলাইন ডেস্ক:    ১২:৪৪ পিএম, ২০২১-০২-০৭    77


হায় মৃত্যু! তুমিই সত্য আর কিছু না

হারুনের সঙ্গে দেখা উত্তরা ক্লাবে। একটা কাজে গিয়েছিলাম বিকালের দিকে। হারুন লং টেনিস খেলে বেরিয়েছেন। শরীর থেকে ঝরঝর ঘাম ঝরছে। পরনে শর্ট প্যান্ট, পায়ে কেডস। দেখে মনে হলো না কোনো অসুখ-বিসুখ আছে। অভ্যর্থনা কক্ষে বসে কথা বলছেন তার ভাগ্নের সঙ্গে। আমাকে দেখেই বললেন, ‘ভাইছা কোত্থেকে আইলেন এই অসময়ে। এক কাপ কফি খাইয়া যান। ’ হারুনের কাছে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসলাম। আমার মুখে মাস্ক। কফি এলো। দুজন একসঙ্গে বসে কফি শেষ করলাম। হারুন উচ্ছল ছিলেন। চলাফেরায় একটা ভাব ছিল। বললেন, আমাদের বন্ধু ইব্রাহিম (এমপি চাটখিল) ঘরে ঢুকে গেছেন। বিশাল হুজুর হয়ে গেছেন। দাড়ি রেখে নামাজ কালেমা ধরেছেন। দুনিয়া নিয়ে ভাবনা বদলে গেছে। আমি বললাম, অনেক দিন দেখা হয় না। ফোন করেন মাঝেমধ্যে। হারুন আবার বললেন, দেখলে চিনবেন না। করোনা সব বদলিয়ে দিয়েছে। আপনার শরীর কেমন এখন? করোনা হওয়ার পর অনেকের শরীর দীর্ঘদিন দুর্বল থাকে। বললাম, শরীর এখন ভালো। অফিস করি পুরো সময়। বাসায় যাই। এই তো আছি। তবে আমারও অনেক ভাবনায় পরিবর্তন এসে গেছে। দুই দিনের দুনিয়া। ভালো লাগে না অনেক কিছু। মনে হয় আজ আছি কাল নেই। হারুন বললেন, ভাই, একটা কথা বলি। হাঁটাচলা করবেন। বেঁচে থাকতে হবে আপনাদের। দেখেন না আমি টেনিস খেলে এলাম। শরীর পুরো ফিট। আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। গ্রামেও যাই। বললাম, সাবধানে থাকবেন। বিদায় নিয়ে চলে এলাম। কিছু দিন পরই শুনলাম হারুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। ফোনে কথা হলো। বললেন, এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আড়াই মাস চিকিৎসা নিলেন হারুন। না, ফিরলেন না আর। চলে গেলেন চিরতরে না-ফেরার দেশে। আর আসবেন না। দেখা হলে বলবেন না, ভাইছা কেমন আছেন?

হারুনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। ব্যবসা করতেন। বিয়ে করেছিলেন কর্নেল (অব.) সরোয়ার হোসেন মোল্লার মেয়েকে। সরোয়ার ভাই রক্ষীবাহিনীর তিন শীর্ষ কর্মকর্তার একজন ছিলেন। পরবর্তী জীবনে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। দারুণ মানুষ। বাংলাদেশ প্রতিদিনে রক্ষীবাহিনীর সেই দিনগুলো নিয়ে লিখেছেন। টেনে এনেছেন বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতার কথা। সরোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক আড্ডা হতো আগে। এ কারণে হারুনকে মজা করে জামাইও ডাকতাম। হারুন হাসতেন। বলতেন, কী আর করব, শ্বশুর-জামাই দুজনের সঙ্গেই আপনি চলেন। আহারে হারুনের সেই হাসিমাখা মুখ আর দেখব না। মানুষের এই জীবন এত ছোট কেন হয়? একটা কচ্ছপও সাড়ে তিন শ বছর বাঁচে। আর মানুষ চলে যায় বড় আগে। কিছুই করার থাকে না। করোনায় আরও কঠিন বার্তা পেয়েছে মানব জাতি। আজ আছি কাল নেই। দুনিয়ার কোনো হাসপাতালই এখন আর শেষ ভরসা নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রশ্নের বাইরে নয়। ডাক এলেই চলে যেতে হয়। চলে যেতে হবে। এক মুহূর্তও থাকার সুযোগ নেই। করোনাকাল আমাদের অনেক কিছু জানিয়ে দিয়ে গেছে।

সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মনিরুজ্জামান ভাই আমাকে স্নেহ করতেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনে কলাম প্রকাশের পরই ফোন করতেন। বলতেন, তোমার লেখাটা এইমাত্র পড়ে শেষ করলাম। দারুণ লিখেছ। সাহস করে এখন কেউ আর সত্য বলতে চায় না। লিখতেও চায় না। আপনজনদের ভালোর জন্যই সত্যটা বলতে হবে কাউকে না কাউকে। সত্যিকারের কাউকে পছন্দ করলে তার ভুলটা অবশ্যই ধরিয়ে দিতে হবে। এখন সবাইকে খুশি করার কথা বলি আমরা। ক্ষমতা দেখলে নতজানু হয়ে কদমবুচি করি। আত্মমর্যাদার জায়গাটুকু আর নেই। সবকিছু শেষ হয়ে